লিখেছেন হাসিব মিয়া: বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চর্চা চলে নির্বাচন দিয়ে, কিন্তু বাস্তবে রাজনীতি যেন ঘুরে বেড়ায় কয়েকটি পরিবার কিংবা বংশের মধ্যেই। তিনটি বড় রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে স্থানীয় ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত—পরিবারতন্ত্র যেন হয়ে উঠেছে এক অলিখিত নিয়ম। প্রশ্ন উঠছে—এটা কি গণতন্ত্র, নাকি একটি শ্রেণীশাসনের আধুনিক রূপ?
পরিবারতন্ত্রে বন্দি রাজনীতি
যদি পেছন ফিরে তাকাই, দেখব—যে এলাকায় একসময় একজন লোক এমপি ছিলেন, আজ তার ছেলে কিংবা মেয়েই সেই পদে আসীন। শুধু জাতীয় সংসদেই নয়, স্থানীয় সরকার, পৌরসভা, এমনকি ইউনিয়ন পরিষদেও দেখা যায় একই পরিবারের সদস্যরা একাধিকবার নির্বাচিত হচ্ছেন। রাজনীতি যেন বংশানুক্রমে চলা পেশায় পরিণত হয়েছে।
তবে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে—জনগণও এই চক্রের বাইরে গিয়ে বিকল্প ভাবতে চাইছে না। কেবল পরিচিতি বা "অমুকের ছেলে/মেয়ে" পরিচয়ের ভিত্তিতেই ভোট দেওয়া হচ্ছে। এমনকি প্রার্থীর শিক্ষা, দক্ষতা, নীতি বা জনসেবার ইতিহাস—এসব প্রায়ই উপেক্ষিত।
গণতন্ত্রের মোড়কে শ্রেণীশাসন
এই পরিবারতন্ত্রের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—ক্ষমতার একচেটিয়া ব্যবহার। যারা একবার ক্ষমতায় আসে, তারা পরিবারসহ পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে। প্রশাসন, পুলিশ, ঠিকাদারি, জমি-বাড়ি—সব ক্ষেত্রেই এক ধরনের আধিপত্য বিস্তার করে।
ফলে দেখা যায়, গ্রামগঞ্জের মতো দুর্বল কাঠামোর এলাকাতেও রাজনৈতিক পরিচয়ে মদদ পেয়ে চাঁদাবাজি, খুন, গুম, ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধের মাত্রা বাড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, এ ধরনের অপরাধীরা অনেক সময় স্থানীয় ক্ষমতাসীন পরিবারের সদস্য বা আশ্রিত।
প্রশাসনও অনেক সময় নিরব থাকে। কেননা, তারা জানে—আজ না হোক, কাল এ পরিবার আবার ক্ষমতায় আসবে। ফলে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
জনসচেতনতা না বাড়লে সমাধান অসম্ভব
গণতন্ত্রের প্রধান ভিত্তি হলো সচেতন ভোটার। কিন্তু আমাদের দেশের অনেক মানুষ জানেন না—
- ভোট দেওয়া শুধু অধিকার নয়, দায়িত্বও;
- জনপ্রতিনিধির কাজ হচ্ছে জনগণের সেবা, দখল নয়;
- জনপ্রতিনিধির যোগ্যতা বিচার করতে হবে তার আদর্শ, কাজ, এবং জনসম্পৃক্ততার ওপর ভিত্তি করে, নাম বা বংশের ওপর নয়।
যদি মানুষ নিজের রাজনৈতিক অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন না হয়, তাহলে এই চক্র কখনো ভাঙবে না। বরং দিনে দিনে এই বংশানুক্রমিক শ্রেণী আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। ফলাফল—গণতন্ত্র শুধু নামে থাকবে, বাস্তবে থাকবে এক প্রকার আধুনিক সামন্তবাদ।
কী করা যেতে পারে?
- রাজনৈতিক শিক্ষা: পাঠ্যবইয়ে রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্র ও দায়িত্ব নিয়ে আরও কার্যকর অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
- জনমাধ্যমে সচেতনতা: সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিতভাবে বংশানুক্রমিক রাজনীতির ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরতে হবে।
- ভোটারদের মূল্যায়ন ক্ষমতা গড়ে তোলা: প্রার্থীকে কেবল পরিচয়ের জন্য নয়, কাজের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা—এই চর্চা গড়ে তুলতে হবে।
- যুব সমাজকে উৎসাহিত করা: রাজনীতিতে নতুন, শিক্ষিত ও আদর্শবান নেতৃত্ব আনতে তরুণদের অনুপ্রাণিত করতে হবে।
শেষ কথা
বাংলাদেশের গণতন্ত্র টিকে থাকুক, সেটাই আমাদের সবার কাম্য। তবে সেই গণতন্ত্র যেন কিছু পরিবারের হাতে বন্দি না থাকে, সেটা নিশ্চিত করাও আমাদের সকলের দায়িত্ব। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজের এলাকা, নিজের ভোট এবং নিজের ভবিষ্যতের প্রশ্নে কখনোই নিরব থাকা উচিত নয়।
একজন নাগরিক হিসেবে নিজেকে প্রশ্ন করুন—আপনি কি সত্যিই স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারেন? ভোট দেন বিবেক দিয়ে, নাকি প্রভাব দেখে? উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে গণতন্ত্রের চর্চা কাগজে থাকবে, বাস্তবে নয়।






