বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেছেন, আলোকচিত্র শুধু সময়ের আকার নয়, এটি ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। একটি ছবি হাজারো কথা বলার ক্ষমতা রাখে, অনেক সময় শব্দের চেয়ে বেশি সত্য উদ্ঘাটন করে। ফটোগ্রাফি এমন এক যুগান্তকারী আবিষ্কার যা আমাদের বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গিকে পাল্টে দিয়েছে। ছবি আমাদের শুধু ঘটনাবলী দেখায় না, সেই ঘটনার পেছনের গভীর গল্পও তুলে ধরে। ক্যামেরার এক ক্লিকে তোলা ছবি কখনো কখনো হৃদয়ে গভীর ব্যথা জাগায়, আবার জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়ার শক্তিও যোগায়।
বুধবার (২৮ মে) দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে ‘রুপসী বাংলা জাতীয় আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতা’ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি একেএম মহসিন। প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজকল্যাণ ও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এস শারমিন মুরশিদ। এছাড়া জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ, লেখক ও গবেষক ওবেইদ জায়গীরদার, সাধারণ সম্পাদক বাবুল তালুকদার ও অন্যান্যরা বক্তব্য রাখেন।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, একটি ছবি হাজারো আবেগ, মেজাজ ও বার্তা বহন করতে পারে, এমনকি এমন ভাবনার জন্ম দিতে পারে যা ভাষায় প্রকাশ সম্ভব নয়। তিনি ২০১৫ সালের ২ সেপ্টেম্বরের ঐতিহাসিক একটি ছবির কথা স্মরণ করিয়ে দেন, যেখানে ভূমধ্যসাগরের তীরে তিন বছর বয়সী আয়লান কুর্দির মৃতদেহ পড়ে ছিল। সেই ছবি বিশ্ববাসীকে যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা ও মানবতার সংকটের কথা বলেছিল। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের ভেতর শরণার্থী আয়লান ও তার পরিবারের ট্রাজেডি ক্যামেরার লেন্সে বন্দী হয়, যা সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
তিনি আরো জানান, ১৯৯৩ সালে দক্ষিণ সুদানে এক ক্ষুধার্ত শিশুর খাদ্য সহায়তা কেন্দ্রের দিকে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্যও ইতিহাসের এক মর্মস্পর্শী ছবি। শিশুটির সাথে শকুনের অপেক্ষা করা ছবি বিশ্বকে দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা বুঝিয়েছিল এবং ছবিটি তুলে ধরার জন্য আলোকচিত্রী কেভিন কার্টার পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছিলেন। যদিও ওই ছবিটি নৈতিক প্রশ্নও সৃষ্টি করেছিল, তবে তার গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।
কাদের গনি বলেন, বাংলাদেশের ফটোসাংবাদিকরা নানা সময়ে দেশের ইতিহাসের সাক্ষী ও সংগ্রামী। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময়ের বিভিন্ন ছবি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে জনমনে সচেতনতা সৃষ্টি করেছিল। সীমান্তে ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ফেলানির ঝুলন্ত লাশের ছবি বিশ্ববাসীকে ব্যাপক সাড়া দিয়েছিল। এইসব ছবি দেখিয়ে ফটোসাংবাদিকরা সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেছেন।
তিনি সাংবাদিকদের স্মরণ করিয়ে দেন, সংবাদপত্রে ভাষার সঙ্গে ছবির গুরুত্ব অপরিসীম। শব্দ যখন তথ্য দেয়, তখন ছবি তা জীবন্ত করে তোলে, অনেক সময় শব্দেরও বাইরে গিয়ে বার্তা পৌঁছে দেয়। তাই ফটোসাংবাদিকতা সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা এবং এ ক্ষেত্রে কাজ করা আলোকচিত্রীদের অবদান অত্যন্ত গৌরবময়।
স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতা যুদ্ধ, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিপ্লব পর্যন্ত সবসময় ফটোসাংবাদিকরা দেশের সংগ্রামের জীবন্ত দলিল তৈরি করেছেন। এ কাজের জন্য অনেককে জীবন দিতে হয়েছে।
তিনি বিশেষ করে ২০১৮ সালে রয়টার্সের ফটোসাংবাদিক মোহাম্মদ পনির হোসেনের পুলিৎজার জয় এবং বাংলাদেশের ১০ জন আলোকচিত্রী যাঁরা ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো পুরস্কার পেয়েছেন, তাদের অবদান তুলে ধরেন। এছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশি আলোকচিত্রীদের বিভিন্ন সম্মাননা ও পুরস্কার অর্জনের কথা উল্লেখ করেন।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, দেশে এখনও কোনো আলোকচিত্রী স্বাধীনতা পদক পাননি, যদিও একুশে পদক ও শিল্পকলা পদক পেয়েছেন অনেক দক্ষ আলোকচিত্রী। এ তথ্য তুলে ধরে তিনি ফটোসাংবাদিকতার মর্যাদা ও তাদের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
তিনি বলেন, ফটোসাংবাদিকরা শুধু ছবি তুলে না, তাদের কাজ দেশের ইতিহাস, সংগ্রাম ও মানবতার কথাই বলে। তাই তাদের অবদানকে ছোট করে দেখা উচিত নয়, বরং দেশের গৌরব হিসেবে ধারণা করা দরকার।






