আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবে। শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ব্যালট বাক্স সুরক্ষায় প্রয়োজনে আইন অনুযায়ী বল প্রয়োগ করা হবে বলে জানিয়েছেন সেনা সদরের সামরিক অপারেশন্স পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার, নির্বাচন কমিশন, বেসামরিক প্রশাসন এবং সব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী একটি অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যা যা করণীয় তা করতে বদ্ধপরিকর।’
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে গুলিস্তানে জাতীয় ফুটবল স্টেডিয়াম এলাকায় ‘ইন এইড টু দ্য সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় নিয়োজিত সেনাবাহিনীর কার্যক্রম বিষয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি আরো বলেন, নির্বাচনে সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে এক লাখ সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। আগের নির্বাচনে যেখানে সর্বোচ্চ ৪০ থেকে ৪২ হাজার সদস্য স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দূরবর্তী এলাকায় অবস্থান করতেন। সেখানে এবার প্রথমবারের মতো ভোটকেন্দ্রের আঙিনা পর্যন্ত টহলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আগের নির্বাচনগুলোতে এই অনুমতি ছিল না।
এবার ভোটারদের নিরাপদে কেন্দ্রে যাতায়াত ও আস্থা ফিরিয়ে আনতেই বাড়তি এই ব্যবস্থা ২০ জানুয়ারি থেকে কার্যকর রয়েছে। সারা দেশে সেনা সদস্যরা নিয়মিত টহল কার্যক্রম পরিচালনা করছেন এবং উপজেলা পর্যায়ে ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। সাধারণ ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন, সেটা মাথায় রেখে সেনাবাহিনী প্রধান প্রয়োজন অনুসারে ন্যূনতম সেনা সদস্যদের সেনানিবাসে রেখে বাকি সব সেনা সদস্যকে নিয়োগ করেছেন সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য।
এর আগে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ উপলক্ষে গুলিস্তানের জাতীয় স্টেডিয়ামে অবস্থিত সেনা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন এবং অসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
এদিকে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনী। যেখানে সেনা মোতায়েন রয়েছে, সেনাপ্রধান স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, আমরা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করব। সাধারণ মানুষ যেন নির্বিঘ্নে ও নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করাই আমাদের অন্যতম দায়িত্ব।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারলে জনগণই সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষতা বুঝতে পারবে। আলাদা করে কিছু প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই।
নির্বাচন কমিশন, অসামরিক প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত রয়েছে।’ সেনাপ্রধানের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অসামরিক প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে আমরা আশ্বস্ত করেছি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে যেকোনো প্রয়োজনে সেনাবাহিনী সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’
নির্বাচনে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, সেনাবাহিনীর জন্য নির্দিষ্ট ‘রুলস অব এনগেজমেন্ট’ রয়েছে। আইনের আওতায় থেকেই সেনা সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। কোনো পরিস্থিতিতে যদি বল প্রয়োগ একান্ত প্রয়োজন হয়, তবে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ধাপে ধাপে বল প্রয়োগের মাত্রা বাড়ানো হবে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, ‘আমাদের যে প্রয়োজনীয় যানবাহন তা অপ্রতুল, আমরা অসামারিক প্রশাসনের কাছে সাহায্য চেয়েছি যেন তারা রিকুইজিশন করে আমাদের গাড়ি দেয়। সেটাও যখন দিতে পারছে না তখন আমরা গাড়ি হায়ার করে হলেও সেনা সদস্যরা যাতে টহল দিতে পারেন সে ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সেনা সদস্যরা প্রস্তুত এটার জন্য, অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন, দিনরাত টহল পরিচালনা করছেন, শুধু ভোটারদের আস্থার জায়গাটা ফিরিয়ে আনার জন্য।’
তিনি বলেন, ‘একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচনের আগেই কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক এবং নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি। আর যে কারণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গত ১০ জানুয়ারি আমাদের যে মোতায়েন সংখ্যা ছিল সেটি ৩৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজারে উন্নীত করেছি। পরে ২০ জানুয়ারি এক লাখ সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি নৌবাহিনী পাঁচ হাজার এবং বিমানবাহিনী তিন হাজার ৭৩০ জন সেনা মোতায়েন করেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সারা দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬২টি জেলায় ৪১১টি উপজেলায় এবং মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে মোট ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে নিয়মিত টহল যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে। চেকপোস্ট স্থাপনের মাধ্যমে নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি অস্ত্র উদ্ধার কার্যক্রম চলমান রেখেছে। বিজিবি, পুলিশ, আনসারের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েনের যে দৃশ্যমান প্রভাব সেটা কিন্তু আপনারা (সাংবাদিক) দেখতে পাচ্ছেন। অস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যা যেমন অনেক গুণ বেড়ে গেছে। অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে।’
অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গত ২০ জানুয়ারি থেকে আজ পর্যন্ত অর্থাৎ এই ১৪ দিনে আমরা প্রায় দেড় শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার করেছি। যার অধিকাংশই বিদেশি পিস্তল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখন পর্যন্ত ১০ হাজার ১৫২টি অস্ত্র, দুই লাখ ৯১ হাজার গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে এবং ২২ হাজার ২৮২ জন চিহ্নিত সন্ত্রাসী এবং দুষ্কৃতকারীকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে।’
নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘন প্রসঙ্গে জামায়াত ও বিএনপির অভিযোগের বিষয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন এলেই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের একটি সংস্কৃতি দেখা আছে আমাদের। যতক্ষণ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি না হয় বা তারা হয়রানির শিকার না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা ইনভলব হচ্ছি না। তবে কোনো কারণে সাধারণ মানুষ ও জানমালের ক্ষতি বা অসুবিধা হয় এবং অসামরিক প্রশাসন যদি মনে করে সেনাবাহিনীর সহায়তা প্রয়োজন তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে সহযোগিতা করবে। আর নির্বাচনের আচরণবিধি দেখবে নির্বাচন কমিশন।’
নির্বাচনে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি টেকনোলজি বা প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে, সুরক্ষা অ্যাপ ব্যবহার করা হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে। পুলিশের কাছে বডিওর্ন ক্যামেরা থাকছে। এ ছাড়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো ড্রোন এবং অন্যান্য প্রযুক্তির ব্যবহার করবে, যাতে দ্রুততম সময়ে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব হয়।’
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, ‘এখনো খোয়া যাওয়া সব অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমরা হারানো অস্ত্রগুলো উদ্ধার করার জন্য সার্বক্ষণিক অভিযান জারি রেখেছি।’
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এবারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সোশ্যাল মিডিয়া শুধু না, এর সঙ্গে যদি আমি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যোগ করে দিই, তাহলে তো এখন আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, যেকোনো একজনের চেহারা শুধু থাকলেই হলো, যেকোনো কিছু তৈরি করা সম্ভব। সেটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্যই আমি আপনাদের (সাংবাদিক) কাছে সাহায্য চেয়েছি, আপনারা যদি তাৎক্ষণিকভাবে যেকোনো একটা মিথ্যা বা অপতথ্যের প্রচারের আগেই মেইনস্ট্রিম মিডিয়া থেকে যদি বস্তুনিষ্ঠ এবং তথ্যনির্ভর একটা সংবাদ প্রকাশ করেন, তাহলে অপপ্রচার, অপতথ্য অনেকটাই রোধ করা সম্ভব হবে।’
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন আরো বলেন, ‘নির্বাচনের পর আমরা কত দিন থাকব, এটা সরকারের সিদ্ধান্ত। সরকারের সিদ্ধান্তে আমরা মোতায়েন হয়েছি, ঠিক একইভাবে আমরা কবে নির্বাচনী দায়িত্ব ছেড়ে সেনানিবাসে ফিরব সেটাও সরকারের সিদ্ধান্ত।’
দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনে সামরিক হেলিকপ্টার ও নৌযানের মাধ্যমে নির্বাচনী কর্মকর্তা ও নির্বাচনী সরঞ্জাম পরিবহন করা হবে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় দেশের বিভিন্ন স্থানে আগাম হেলিকপ্টার মোতায়েন থাকবে।’






