
বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) বিগত সরকারের আস্থাভাজন ও জুলাই আন্দোলনবিরোধী ‘কুশীলব’দের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত এক বছরেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় শেখ হাসিনার আস্থাভাজনদের কবল থেকে রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেলটি মুক্ত হতে পারছে না বলে মানববন্ধনে অভিযোগ করা হয়।
মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলন ও সমমনা নয়টি সংগঠন নিয়ে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশটি আয়োজিত হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ ইতিমধ্যে এক বছর পার হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ‘জুলাই গণহত্যায় বিটিভির কুশীলব’-দের একজনকেও গ্রেফতার, বরখাস্ত, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা, বাধ্যতামূলক অবসর কিংবা অন্য কোনো বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি।
এ সময় বিটিভির কয়েকজন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, তাদের বিটিভির গুরুত্বপূর্ণ পদে রেখে আগের মতো ফ্যাসিবাদী রাজত্ব কায়েমের মাধ্যমে দুর্নীতি, লুটপাট এবং তথ্য পাচারের ব্যবস্থা করেছে কর্তৃপক্ষ।
বিটিভির উপ-মহাপরিচালক (বার্তা) ড. সৈয়দা তাসমিনা আহমেদ, প্রোগ্রাম ম্যানেজার (তৎকালীন জেনারেল ম্যানেজার, চলতি দায়িত্ব) মাহফুজা আক্তার, সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার (চলতি দায়িত্ব) সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মো. মনিরুল ইসলাম এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে গঠিত প্রচার-প্রচারণা কমিটির প্রধান-নির্বাহী প্রযোজক (বার্তা) শামছুল আলমের নামে উঠে আসে বক্তৃতায়।
বক্তারা বলেন, শেখ হাসিনার ‘এই আস্থাভাজনদের’ ভয়াল ছোবল থেকে যেন মুক্ত হচ্ছে না দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেল বাংলাদেশ টেলিভিশন। জুলাই আন্দোলনকালীন বিটিভির মহাপরিচালক ড. জাহাঙ্গীরকে ‘আওয়ামী আশীর্বাদপুষ্ট ও বিশেষ সুবিধাভোগী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।
মানববন্ধনের সভাপতি মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিক তালুকদার বলেন, যেখানে বিটিভিতে কর্মরত জুলাই আন্দোলনবিরোধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, সেখানে আওয়ামী পুনর্বাসনে ব্যস্ত সময় পার করছেন মহাপরিচালক মাহবুবুল আলম। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ও এ ব্যাপারে রহস্যজনক ভূমিকা পালন করছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র হত্যায় মিডিয়া কুশীলবদের অন্যতম উপ-মহাপরিচালক ড. সৈয়দা তাসমিনা আহমেদ এখনো রয়েছেন বহাল তবিয়তে।
সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বিটিভির প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইসলামকে ‘সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের টাকার উৎস’ বলে মন্তব্য করেন মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিক তালুকদার।
আন্দোলনকালে ছাত্রদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রচারে সেসময় বিটিভিতে গঠিত কমিটির প্রধান ছিলেন শামছুল আলম- এমন মন্তব্য করে অলিদ বিন সিদ্দিক তালুকদার বলেন, বিচারের বদলে উল্টো তাকে প্রমোশন দিয়ে বার্তা শাখার নির্বাহী প্রযোজক ও প্রোগ্রাম ম্যানেজার বানানো হয়। জুলাই আন্দোলনে বিটিভিতে হামলাকারী হিসেবে শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এনিসহ বিএনপি-জামায়াত নেতা ও আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলাকারী তৎকালীন জেনারেল ম্যানেজার মাহফুজা আক্তারের বিরুদ্ধেও নেওয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা।
মানববন্ধনে নেতারা বলেন, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালালেও তার আস্থাভাজন কর্মকর্তারা এখনো বিটিভিতে বহাল রয়েছেন। ‘হাসিনাস ম্যান’ দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব মো. মহসিনের প্রভাবে তার স্ত্রী তাসমিনা আহমেদ ও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের নাম ভাঙিয়ে বার্তা শাখার শামছুল আলম এখনো প্রভাব খাটিয়ে যাচ্ছেন পুরো বিটিভি জুড়ে।
মহাপরিচালক উল্লিখিত কর্মকর্তাদের নিয়ে খ ও গ ক্যাটাগরির শিল্পীদের দিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান নির্মাণ, নতুন কুঁড়িকে বিতর্কিত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগ করেন বক্তারা।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, সারা দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যেখানে জুলাই আন্দোলনবিরোধীদের গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে, সেখানে ‘বিটিভির কুশীলবদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা না নেয়ার রহস্য’ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আগামী ২৩ অক্টোবরের মধ্যে তাদের গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করা না হলে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে মানববন্ধনে হুঁশিয়ারি করা হয়।
ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলনের সভাপতি মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিক তালুকদারের সভাপতিত্বে এবং যুগ্ম আহ্বায়ক ও জাতীয় মানবাধিকার সমিতির চেয়ারম্যান মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসার সঞ্চালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য দেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি ও বিএনপি নেতা এম রফিকুল ইসলাম রিপন, মানবাধিকার সংগঠক ও ন্যাশনাল লেবার পার্টির দলীয় মুখপাত্র মো. শফিকুল ইসলাম, ডিইউজে সদস্য তাজুল ইসলাম প্রমুখ।
মানববন্ধনে উপস্থিত থেকে সংহতি প্রকাশ করেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক প্রচার সম্পাদক জাকির হোসেন, ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ স্বপ্নীল সরকার, সহকারী প্রচার সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন আরিয়ান, সদস্য সুহিল ইরফান কৌশিক, ইমরান আহমেদ চৌধুরী, শিহাব উদ্দীন সরকার, তোফায়েল আহমেদ প্রমুখ।
/এমএইচ






