প্রতিবার ঈদ এলেই বাড়ি ফেরার তাড়া অনুভব করি। কিন্তু এবার ছবিটা একটু আলাদা—আমি যাচ্ছি না বাড়ি, বরং বাড়িই যেন চলে এসেছে আমার কাছে। একটু পরিষ্কার করে বলি, আমার কাছে ঈদের মানে পরিবারকে সময় দেওয়া। আর পরিবার মানেই মা, বোনেরা, পরিচিত উঠান, চেনা গন্ধ। তবে এবার মা-ই এসেছেন ঢাকায় আমার কাছে, ঈদটা আমার সংসারে কাটাতে।
তবে এই সিদ্ধান্তের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে আমার ছোট ছেলে—নবান্ন নির্ণয়। ঈদের আগে থেকেই সে মাকে আনতে বায়না ধরেছে। মজার বিষয় হলো, ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি, ভালোবাসা নিচের দিকে ধাবিত হয়—এখন এর মানে খুব ভালো করে বুঝি। আগে মা প্রতিদিন ফোন করে বলতেন, ‘কবে আসবি?’ এখন তিনি অপেক্ষায় থাকেন তাঁর প্রিয় নাতিকে কাছে পাওয়ার।
সারা বছর নানা ছুটিতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কোথাও বেড়াতে যাওয়া হলেও ঈদে সব সময় চেষ্টা করি গ্রামের বাড়ির পথ ধরতে। ঈদের সকালটা মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙা, নামাজ শেষে তাঁর হাতে বানানো খাবার খাওয়াটা যে এক অন্যরকম তৃপ্তি দেয়! ‘আরেকটু খা’, ‘এইটা খেয়ে দেখ’—এই সব কথায় বিরক্ত হলেও মায়ের ভালোবাসার রঙ মুছে যায় না। ফলের থালা এক পাশে রেখে যখন মা চলে যান, আমি চুপিচুপি সব খেয়ে ফেলি।
বিকেলের দিকে বোনেরা আসে, বন্ধুরা দেখা করতে আসে, উঠানে হৈহৈ করে জমে ওঠে ঈদের আনন্দ। আমার কাছে ঈদ মানে এই একত্র হওয়ার সময়—পরিবারের রিইউনিয়ন।
একটা বড় পরিবার মানেই নানা রঙের গল্প। কারও সঙ্গে মনোমালিন্য হয়, কারও সঙ্গে খুনসুটি—তবু দিন শেষে আবার সবাই একসঙ্গে বসে হাসে, খায়, গল্প করে। এখন অনেকেই ঈদের ছুটি পরিবার নিয়ে দূরে কাটাতে চান, কিন্তু বছরে মাত্র দুইটা ঈদ—এই সময়টা প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটালে মনটা সত্যি শান্তিতে ভরে ওঠে। নিউক্লিয়ার পরিবারে অভ্যস্ত আমরা হয়তো একা ছুটি কাটাতে ভালোবাসি, কিন্তু ঈদের দিনটা বরং সবাই মিলে ভাগ করে নেওয়া ভালো।
আমার মা প্রায় রোজ ফোন করতেন স্ত্রীকে—‘নবান্নকে নিয়ে বাড়ি আসো, গাছে আম পেকেছে। ওর হাতে একটা আম না পাড়লে শান্তি লাগবে না।’ শেষ পর্যন্ত স্ত্রী ছেলেকে নিয়ে গেল বাড়ি। ছোট্ট ছেলে গাছ থেকে আম পেড়ে একটু খেলো, অনেকটা ফেলে দিল। কিন্তু তাতেই মা দারুণ খুশি।
সেই আনন্দ বুকে নিয়েই এবার মা নিজেই ঢাকায় এসেছেন। আমার ছোট বোনও চলে এসেছে ঢাকার বাসায়। শ্বশুর-শাশুড়িও বিদেশ থেকে ফিরে এখন ঢাকায়। সব মিলিয়ে দুই পরিবারের মানুষজন এবার একসঙ্গে। খুব সম্ভবত, এবারের ঈদটা বেশ আনন্দময়ই কাটবে। কারণ, ঈদের মানে তো একটাই—ভালোবাসার মানুষদের কাছে থাকা, বড় পরিবারে মিলেমিশে থাকা।






