ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান ছায়াযুদ্ধ এখন সরাসরি জ্বালানি যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে ইসরায়েলি হামলার সবুজ সংকেত দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের হাতে এক শক্তিশালী ‘কৌশলগত হাতিয়ার তুলে দিয়েছেন। এই পরিস্থিতির ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি ইসরায়েল ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান কাতারের রাস লাফান প্রাকৃতিক গ্যাস কেন্দ্রে পাল্টা ভয়াবহ হামলা চালায়। কাতার এনার্জির প্রধান সাদ আল-কাবি জানিয়েছেন, এই হামলায় কাতারের এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতার ১৭ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা মেরামত করতে ৩ থেকে ৫ বছর সময় লাগতে পারে।
আরব কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ব্লফ বা ফাঁকা হুমকি ধরতে গিয়ে বড় ভুল করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আরব কর্মকর্তা বলেন, “ট্রাম্প আগে হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরানকে ভুল মূল্যায়ন করেছিলেন, এখন তিনি জ্বালানি কেন্দ্রে হামলার অনুমতি দিয়ে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে গেছেন। যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে একটি ‘আনাড়ি মিত্র’ হিসেবে প্রমাণ করছে।”
হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ
বর্তমানে ইরান কার্যকরভাবে হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা সেখানে একটি ‘ডি ফ্যাক্টো সেফ করিডোর’ বা নিজস্ব নিরাপদ নৌ-পথ তৈরি করেছে। সামুদ্রিক বিশ্লেষণ সংস্থা লয়েডস লিস্ট জানিয়েছে, ইরান তাদের জলসীমা দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য এমনকি ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ফি আদায় করছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌ-পথটি সুরক্ষিত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা ওয়াশিংটনের জন্য বড় ধরনের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি করেছেন যে, তিনি সাউথ পার্সে ইসরায়েলি হামলার বিষয়ে কিছুই জানতেন না। তবে মার্কিন বিশ্লেষক এবং সাবেক কর্মকর্তারা এই দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান শাপিরো বলেন, “ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) সেন্টকমকে না জানিয়ে এমন হামলা চালাবে—এর সম্ভাবনা শূন্য শতাংশ। ট্রাম্প জানতেন এবং অনুমোদন দিয়েছিলেন, এখন তিনি এর পরিণতি দেখে পিছিয়ে আসার চেষ্টা করছেন।”
ইরানের কঠোর হুঁশিয়ারি
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক বার্তায় সাফ জানিয়েছেন, সাউথ পার্স হামলার জবাবে তারা তাদের শক্তির মাত্র সামান্য অংশ ব্যবহার করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, “আমাদের অবকাঠামোতে পুনরায় আঘাত করা হলে আমরা আর কোনো সংযম দেখাব না।”
এই সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৫ ডলার পর্যন্ত স্পর্শ করেছে। ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি সামাল দিতে ৪০ কোটি ব্যারেল জরুরি তেল রিজার্ভ থেকে ছাড়ার ঘোষণা দিলেও বাজারে এর তেমন প্রভাব পড়েনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান এখন এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে যেখানে তাদের হারানোর কিছু নেই। বিশ্ব অর্থনীতি সচল রাখার দায়ভার তেহরানের ওপর নেই, যা তাদের আরও বেপরোয়া করে তুলেছে। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন দেশে ও বিদেশে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে চরম হিমশিম খাচ্ছে। সূত্র: মিডল ইস্ট আই






