গাজা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে এবং ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে এগোতে যুক্তরাষ্ট্র একটি ২১ দফা শান্তি পরিকল্পনা উন্মোচন করেছে। পরিকল্পনায় ইসরাইলি সেনাদের গাজা থেকে পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, জিম্মিদের তাৎক্ষণিক মুক্তি এবং শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করতে রাজি হওয়া হামাস সদস্যদের সাধারণ ক্ষমার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
টাইমস অব ইসরাইলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে এই নথি কয়েকটি আরব ও মুসলিম দেশের সঙ্গে ভাগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনিদের গাজা ছেড়ে যেতে নয়, বরং সেখানে থেকেই পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে উৎসাহিত করা হবে। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের পূর্বঘোষিত নীতি থেকে বড় ধরনের পরিবর্তন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প বলেছিলেন, আমেরিকা গাজা নিয়ন্ত্রণে নেবে এবং দুই মিলিয়ন গাজাবাসীকে স্থায়ীভাবে অন্যত্র সরিয়ে দেবে। এবার তার উল্টো অবস্থান সামনে এসেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণা উল্লেখ করা হয়েছে, যা আগে কখনো ট্রাম্প প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন করেনি।
ইসরাইলের জন্য সুবিধাজনক দিক
প্রস্তাবনায় ইসরাইলের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। যেমন— হামাসকে নিরস্ত্র করা, গাজার সামরিকীকরণ বন্ধ করা এবং জনগণের মধ্যে ডি-র্যাডিকালাইজেশন বা উগ্রবাদ বিরোধী কর্মসূচি চালানো।
তবে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু জাতিসংঘে বলেন, “অক্টোবর ৭–এর পর ফিলিস্তিনিদের জেরুজালেমের পাশে রাষ্ট্র দেওয়া মানে ৯/১১–এর পর নিউইয়র্কের পাশে আল-কায়েদাকে রাষ্ট্র দেওয়া। এটি পাগলামি, আমরা তা কখনো মেনে নেব না।”
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য আশাবাদী ভঙ্গিতে জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে টানা চার দিন ধরে কঠিন আলোচনা চলছে এবং সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছানো গেছে। তিনি বলেন, “সব আঞ্চলিক দেশ এতে যুক্ত, হামাসও জানে, আর ইসরাইলকেও অবহিত করা হয়েছে।”
তার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বলেন, “এই ২১ দফা পরিকল্পনা শুধু ইসরাইলের উদ্বেগ নয়, বরং গোটা অঞ্চলের দেশগুলোর উদ্বেগকেও সমাধান করতে চায়। আমরা আত্মবিশ্বাসী যে শিগগিরই কোনো বড় ধরনের অগ্রগতি ঘোষণা করা যাবে।”
যুক্তরাষ্ট্রের ২১ দফা শান্তি প্রস্তাবের মূল দিকগুলো
গাজাকে একটি সন্ত্রাসমুক্ত ও ডি-র্যাডিকালাইজড অঞ্চল হিসেবে রূপান্তর করা হবে।
পুনর্গঠন ও উন্নয়নের মাধ্যমে গাজাবাসীর জীবনমান উন্নত করা হবে।
প্রস্তাব গ্রহণ করলে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি, ইসরাইলি সেনাদের ধাপে ধাপে প্রত্যাহার।
ইসরাইল প্রস্তাব মেনে নেওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সব জিম্মি (জীবিত ও মৃত) ফেরত।
এরপর ইসরাইল শত শত আজীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি, এক হাজারের বেশি আটক গাজাবাসী ও নিহতদের মৃতদেহ ফেরত দেবে।
শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে আগ্রহী হামাস সদস্যদের সাধারণ ক্ষমা; অন্যরা চাইলে নিরাপদে অন্য দেশে যেতে পারবে।
মানবিক সহায়তা প্রতিদিন ৬০০ ট্রাক প্রবেশ করবে; অবকাঠামো সংস্কার ও ধ্বংসাবশেষ সরানো হবে।
সহায়তা বণ্টন কেবল জাতিসংঘ ও রেড ক্রিসেন্টের মতো নিরপেক্ষ সংস্থা করবে।
অন্তর্বর্তী প্রশাসন পরিচালনা করবে ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটরা; নজরদারিতে থাকবে আন্তর্জাতিক কমিটি।
পুনর্গঠনের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা।
বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, শুল্ক হ্রাস ও সহজ বাজার প্রবেশাধিকার।
কাউকে গাজা ছাড়তে বাধ্য করা হবে না; যারা যাবে, তাদের ফিরে আসার অধিকার থাকবে।
হামাস শাসন থেকে বাদ; সব সামরিক অবকাঠামো ভেঙে ফেলা হবে।
আঞ্চলিক দেশগুলো হামাস ও অন্যান্য গোষ্ঠীর আনুগত্য নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা গ্যারান্টি দেবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা অস্থায়ী স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন করবে, যারা নিরাপত্তা ও পুলিশ প্রশিক্ষণ দেবে।
ইসরাইল গাজা দখল বা সংযুক্ত করবে না; ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ ছাড়বে।
হামাস বিলম্ব করলে সন্ত্রাসমুক্ত এলাকায় ধাপে ধাপে পরিকল্পনা কার্যকর হবে।
ইসরাইল কাতারে ভবিষ্যৎ হামলা চালাবে না; কাতারের মধ্যস্থতার ভূমিকা স্বীকৃত হবে।
উগ্রবাদবিরোধী শিক্ষা ও আন্তঃধর্মীয় উদ্যোগ গ্রহণ।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সংস্কার প্রক্রিয়া শেষ হলে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে।
দীর্ঘমেয়াদে ইসরাইল-ফিলিস্তিনের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা করবে যুক্তরাষ্ট্র।






