একটি বিচিত্র খুনের মামলার পরিপ্রেক্ষিতে নির্মিত হয়েছে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের চেম্বার থ্রিলার “সত্যি বলে সত্যি কিছু নেই”, যেখানে ১৮ বছর বয়সী একটি ছেলে তার ভাইকে খুনের দায়ে অভিযুক্ত। সব প্রমাণই দেখাচ্ছে, ছেলে নিজেই খুন করেছে তার ভাইকে। এখন শুধু রায়ের অপেক্ষা। বিশিষ্ট বিচারক ব্রজেশ্বর দত্ত এই মামলার রায় দেবেন। তবে এই গল্পের গভীরে কি সত্যিই কোনো অবিচল সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব? যে-ই অভিযুক্ত, তার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাদের ব্যক্তিগত মনোভাব, দৃষ্টিভঙ্গি কতটা প্রভাবিত করে? সৃজিত মুখোপাধ্যায় এই প্রশ্নগুলোকে কেন্দ্র করে সিনেমার পটভূমি তৈরি করেছেন।
পূর্বে, এমন খুনের মামলায় জুরিবোর্ডের সিদ্ধান্ত নেওয়া হত, যেখানে ১২ জন সদস্য যুক্তিতর্কের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতেন। তবে ১৯৭৩ সালে ভারতবর্ষে এই পদ্ধতি বাতিল করা হয়, কারণ ১২ জনের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি সিদ্ধান্তকে বিপথগামী করতে পারে। তবে সৃজিত মুখোপাধ্যায় তাঁর সিনেমায় এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছেন যেখানে ব্রজেশ্বর দত্ত এবং তাঁর আশপাশের ব্যক্তিরা যেন একে অপরের জুরিবোর্ড হয়ে ওঠেন, এবং তাদের ব্যক্তিগত মনোভাব কীভাবে মামলার রায়কে প্রভাবিত করতে পারে তা তুলে ধরেছেন।
এটি সিডনি লুমেট পরিচালিত 'টুয়েলভ অ্যাংরি মেন' এবং তার ভারতীয় সংস্করণ 'রুকা হুয়া এক ফয়সালা' থেকে অনুপ্রাণিত, এবং সৃজিত মুখোপাধ্যায় তা আধুনিক পরিবেশে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন। ২০২৩ সালের ২৩ জানুয়ারি সিনেমাটি প্রথম মুক্তি পেলেও এখন এটি হইচই প্ল্যাটফর্মে স্ট্রিমিং হচ্ছে।
“সত্যি বলে সত্যি কিছু নেই” সিনেমার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল গল্পের ভেতরে লুকানো ছোট ছোট মানবিক গল্পগুলো। ১২ জন জুরির চরিত্রে অভিনয় করেছেন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, ঋত্বিক চক্রবর্তী, অর্জুন চক্রবর্তী, রাহুল ব্যানার্জি সহ আরও অনেক তারকা। সিনেমার শুরু থেকেই প্রতিটি চরিত্র নিজেদের স্থান থেকে যুক্তিতর্কে অংশ নেয় এবং একে অপরকে চ্যালেঞ্জ করে। সৃজিত মুখোপাধ্যায় চমৎকারভাবে এই চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে সমাজের নানা স্তরের বাস্তবতা তুলে ধরেছেন।
সিনেমাটিতে ব্রজেশ্বর দত্তের চারপাশের ১২টি চরিত্র একটি একক গল্পের মধ্যে একত্রিত হয়, যা সিনেমার শেষ পর্যন্ত দর্শককে একেবারে নতুন এক দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করতে বাধ্য করে। এছাড়াও, সমাজের বিভিন্ন সমস্যার প্রতিফলনও দেখা যায়, যেমন—ধর্মীয় বিভেদ, সমাজের নিচু স্তরের মানুষের প্রতি বিদ্বেষ এবং এমনকি ভিন্ন যৌন আগ্রহের কারণে সমাজের একটি অংশের প্রতি অবজ্ঞা।
তবে সিনেমার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল, যেভাবে সৃজিত গল্পের ছোট ছোট দৃশ্যগুলোর মধ্যে মানবিকতার বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন, যা দর্শকদের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে। সৃজিতের দক্ষ পরিচালনা এবং অভিনয়শিল্পীদের পারফরম্যান্সের মাধ্যমে সিনেমাটি দর্শকদের এক অনন্য অভিজ্ঞতা প্রদান করেছে।
এর সাথে যোগ হয়েছে সিনেমার চিত্রগ্রহণ, যেটি প্রসেনজিৎ চৌধুরী এবং সম্পাদনার কাজ করেছেন সংঘলাপ ভৌমিক। তাঁদের কাজও সিনেমার মান বাড়িয়েছে। সিনেমার সঙ্গীতের জন্য রাপূর্ণা ভট্টাচার্য্যের গাওয়া গান 'তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা' গল্পের সাথে পুরোপুরি মিল রেখে এক বিশেষ আবহ তৈরি করেছে।
সৃজিত মুখোপাধ্যায় পরিচালিত এই সিনেমাটি দেখতে ভুলবেন না, এটি সঠিকভাবে দেখাতে সক্ষম করেছে যে সত্যি বলেই কিছু নেই, এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তের পিছনে লুকিয়ে থাকে আরও গভীর গল্প।






