ঢাকা   শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রেডিও বার্তা
রেডিও বার্তানিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
খুঁজছি: উপজেলা প্রতিনিধি

ছবি তোলা, আঁকা ও রাখার শরঈ হুকুম

Authorনিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১১:২৩ এএম

ছবি তোলা, আঁকা ও রাখার শরঈ হুকুম

ইসলামে কোনও প্রাণীর ছবি আঁকা, তোলা ও আকৃতি তৈরি করা সম্পূর্ণ হারাম। এটি অনেক বড় গোনাহ। একসময় মুসলিম সমাজেও বিষয়টিকে বড় গোনাহই জ্ঞান করা হতো। কিন্তু ক্যামেরাযুক্ত মোবাইল সহজলভ্য হওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, মুসলমানদের অভিভাবক অনেক আলেমের মধ্যেও ছবি তোলার বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়ার প্রবণতা অনুভব করা যায়।

অথচ, এ ব্যাপারে হাদিস শরিফে কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘কিয়ামতের দিন ছবি অঙ্কনকারীরা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি শাস্তির সম্মুখীন হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৫০)

অন্য আরেকটি হাদিসে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত রয়েছে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা এ সব ছবি আঁকে তাদের কিয়ামতের দিন শাস্তি দেওয়া হবে এবং বলা হবে, তোমরা তোমাদের সৃজিত বস্তুতে (পারলে) প্রাণ সঞ্চার করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৫১) 

তৎকালীন যুগে যেহেতু ছবি তোলার ব্যবস্থা ছিল না; বরং অঙ্কন করা হত, এজন্য হাদিসে এ বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রাণীর ছবি অঙ্কন করা নাজায়েজ হলেও গাছ-তরুলতা ও প্রাণীর ছবিযুক্ত প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি আঁকা জায়েজ। শুধু তাই নয়; এ ধরনের চিত্র ঘরে সাজিয়ে রাখাও বৈধ। তবে, আজকাল ঘর সাজানোর জন্য পশু-পাখির ছোট ছোট মূর্তি পাওয়া যায়, কিন্তু তাদের চোখ থাকে না। কিন্তু সেগুলো দেখেই বোঝা যায় যে, এটি কোনও প্রাণী। মানে যদিও মূর্তিটির চোখ না থাকে কিন্তু সেটি কোনও জীবন্ত প্রাণীর প্রতি ইঙ্গিত করে এবং যদি কেউ এটির দিকে তাকালে বোঝা যায় যে, এটি একটি প্রাণী বা পাখি, তবে এটিও একটি মূর্তি হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এটি ঘরে রাখা জায়েজ হবে না। (জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া আল্লামা ইউসুফ বানুরি টাউনের ফতোয়া নম্বর : ১৪৪৫০৬১০০৬৩৭)

প্রাণীর স্পষ্ট ছবি বিশিষ্ট পোশাক-পরিচ্ছদ ব্যবহার করাও ইসলামে নিষিদ্ধ। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) আমার কাছে আসলেন। তখন আমি একটি পাতলা চাদর দিয়ে নিজেকে আবৃত করে রেখেছিলাম, যাতে ছবি আঁকা ছিল। (এটা দেখে) তিনি রাগান্বিত হলেন। অতঃপর তিনি চাদরটি নিয়ে ছিঁড়ে ফেললেন এবং বললেন, কিয়ামতের দিন কঠিন শাস্তি ভোগকারীদের মধ্যে তারাও থাকবে, যারা আল্লাহর সৃষ্ট প্রাণীর মতো আকৃতি অঙ্কন বা নির্মাণ করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২১০৭)

এ ছাড়া ঘরে কোনও প্রাণীর দৃশ্যমান ছবি রাখাও শরিয়তসম্মত নয়। প্রাণীর স্পষ্ট ছবি বিশিষ্ট কাপড়ের পাশাপাশি মগ, গ্লাস ইত্যাদি ব্যবহার এবং ক্রয়-বিক্রয় থেকেও বিরত থাকতে থাকতে হবে। (ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ২/২০৩, আলবাহরুর রায়েক ২/২৭ ও রদ্দুল মুহতার ১/৬৪৭)

এ বিষয়ে হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘ফেরেশতারা ওই ঘরে প্রবেশ করে না, যে ঘরে মূর্তি বা ছবি রয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম : ২/২১১২) 

শবে বরাত, আশুরা ইত্যাদি বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে আমাদের দেশে নানা ধরনের প্রাণীর আকৃতিতে মিষ্টান্ন তৈরিরও প্রচলন রয়েছে। এটিও সম্পূর্ণ হারাম। ইসলামের দৃষ্টিতে এতে দুটি আপত্তিকর বিষয়ের সমন্বয় ঘটে। ১. কোনও প্রাণীর প্রতিকৃতি তৈরি করা হলো, যা হারাম ও কবিরা গোনাহ। ২. শবে বরাত ইত্যাদিকে উপলক্ষ করে এ ধরনের খাবারের আয়োজন করাকে দ্বীনী বা নেকের কাজ মনে করা হয়, যা সুস্পষ্ট বিদআত ও কুসংস্কার। এজন্য এ উপলক্ষে প্রাণীর আকৃতিতে কোনও ধরনের খাবার তৈরি করা ও ক্রয়-বিক্রয় হারাম। 

ডিজিটাল ছবির হুকুম

প্রাণীর ডিজিটাল ছবি হার্ডডিস্ক বা মেমরিতে থাকা পর্যন্ত এইসব ছবির ব্যাপারে সমকালীন আলেমদের মধ্যে দুইটি মতামত রয়েছে। ১. কিছুসংখ্যক আলেমের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, এসব ছবিও হাদিসে উল্লেখিত হারাম ও নাজায়েজের অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু ইচ্ছে করলে এখান থেকে ছবি প্রিন্ট করা যায়। ২. পাকিস্তানের দারুল উলুম করাচি, আরব বিশ্বসহ বর্তমান যুগের বহুসংখ্যক উলামায়ে কেরামের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, প্রাণীর ডিজিটাল ছবি ঢালাওভাবে জায়েজ নয়, আবার সম্পূর্ণ নাজায়েজও নয়। ছবি ও ভিডিওর বিষয়বস্তু এবং উদ্দেশ্যের বিচারে ডিজিটাল ছবি ও ভিডিও জায়েজ হতে পারে, আবার নাজায়েজও হতে পারে। 

তাদের মতে—ডিজিটাল ছবি একদিক থেকে আয়নায় দেখা যাওয়া প্রতিচ্ছবির মতো। এই আলোকে এসব ছবি তারা জায়েজ মনে করেন। তবে এই দৃষ্টিভঙ্গিতে তারা ডিজিটাল ছবি জায়েজ বললেও যেসব ব্যক্তিদেরকে (গাইরে মাহরাম) এবং ব্যক্তিদের যেসব অঙ্গ (সতর) সরাসরি দেখা জায়েজ নয়, ছবি-ভিডিওতেও সেসব ব্যক্তিদের এবং ব্যক্তির সেসব দৃশ্যকে দেখা জায়েজ নেই। অন্যভাবে বললে এভাবে বলা যাবে, যা-কিছু সরাসরি দেখা নাজায়েজ, ডিজিটাল ছবি ও ভিডিওতেও তা নাজায়েজ। মানে অন্যায় ও অশ্লীলতা কোনও অবস্থাতেই দেখা জায়েজ নেই। সরাসরি হোক কিংবা ডিজিটাল ছবি ও ভিডিওতে হোক- কোনও অবস্থাতেই তা দেখা জায়েজ হবে না। এসবের ছবি-ভিডিওতে ধারণ করাও হারাম।

এখানে মূলকথা হলো—ডিজিটাল ছবির ব্যাপারে দুই ধরনের মত থাকলেও অনেক আলেমের দৃষ্টিতে অধিক নির্ভরযোগ্য মত হলো- এ প্রকারের ছবিও নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। তাই এ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। আর যদি জায়েজও মানা হয়, তাহলেও প্রয়োজন ছাড়া ডিজিটাল ছবিও তোলা যাবে না। তবে বিশেষ প্রয়োজনে, যেমন—আইডি কার্ড, পাসপোর্ট ইত্যাদির জন্য ছবি অঙ্কন করা, তোলা ও সংরক্ষণ করা যাবে। 

কিন্তু এমন কোনও নারী, যার ওপর হজ ফরজ, তিনি যদি মনে করেন যে, পর্দাও ফরজ। পাসপোর্টের জন্য ছবি তুললে তার আরেকটি ফরজ বিধান পর্দার হুকুম লঙ্ঘিত হবে এবং এ ক্ষেত্রে তিনি তার বদলে অন্য কাউকে দিয়ে বদলি হজ করাতে চান, তাহলে তার হজ আদায় হবে না। এই পরিস্থিতিতে আল্লাহ তায়ালার হুকুমের সামনে তার নিজের যুক্তি ও আবেগকে সমর্পিত করতে হবে এবং পাসপোর্টের জন্য ছবি তুলতে হবে। কারণ, হজের জন্য ছবিযুক্ত পাসপোর্ট করা এবং ছবি পাসপোর্ট ইমিগ্রেশনে চেকআপ হওয়া—এ সব কিছুই হজের ব্যবস্থাপনাগত বিষয়। হজে গমনেচ্ছু ব্যক্তির এক্ষেত্রে কিছুই করার থাকে না; বরং এখানে সে আইনগতভাবেই এসব কাজ করতে বাধ্য হয়। তাই এসব ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিষয়ের দায়ভার কর্তৃপক্ষের ওপরই বর্তাবে। (আল বাহরুর রায়েক : ৩/৬০, আদ্দুররুল মুখতার : ২/৫৯৮, শরহুন নববী : ১৪/৮১, উমদাতুল কারী : ২২/৭০, রদ্দুল মুহতার : ১/৬৪৭, মিরকাতুল মাফাতিহ : ৮/৩২৩, আলবাহরুর রায়েক : ২/২৭ ইত্যাদি। 

লেখক: মাদ্রাসা শিক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মী

নিয়োগ চলছে
সংবাদকর্মী আবশ্যক
রেডিও বার্তা টিমে যোগ দিয়ে ক্যারিয়ার গড়ুন
আরও সংবাদ লোড হচ্ছে...
✕
Radio Barta App Screen 1
Radio Barta App Screen 2
রেডিও বার্তার সব নিউজ পেতে ডাউনলোড করুন মোবাইল অ্যাপ
ক্লিক করুন